Information on Tinnitus

টিনিটাস (কানে শব্দ শোনা)

রোগীদের জন্য তথ্যপত্র

টিনিটাস কী?

টিনিটাস হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে বাইরে কোনো শব্দ না থাকলেও কানে বা মাথার ভেতরে বিভিন্ন ধরনের শব্দ শোনা যায়।

যেমন—

  • ঝিঁঝিঁ পোকার মতো শব্দ
  • ভোঁ ভোঁ শব্দ
  • শোঁ শোঁ শব্দ
  • সিটি বাজানোর মতো শব্দ
  • ঘণ্টা বাজানোর মতো শব্দ
  • হৃদস্পন্দনের মতো “ধুপধুপ” শব্দ

এই শব্দ এক কানে, দুই কানে অথবা মাথার ভেতর থেকে আসছে বলে মনে হতে পারে।

টিনিটাস নিজে কোনো রোগ নয়; এটি অন্য কোনো সমস্যার একটি লক্ষণ।


টিনিটাস কেন হয়?

এর অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন—

কানের সমস্যা

  • বয়সজনিত শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া
  • দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দে থাকা (কারখানা, মাইক, হেডফোন ইত্যাদি)
  • কানে ময়লা (Ear Wax)
  • কানের সংক্রমণ
  • কানের পর্দা বা মধ্যকর্ণের রোগ
  • মেনিয়ের’স ডিজিজ
  • অন্যান্য অন্তঃকর্ণের সমস্যা

শরীরের অন্যান্য রোগ

  • উচ্চ রক্তচাপ
  • ডায়াবেটিস
  • থাইরয়েডের সমস্যা
  • রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)
  • রক্তে চর্বি (কোলেস্টেরল) বেশি থাকা
  • রক্তনালীর কিছু রোগ
  • চোয়ালের জয়েন্টের (TM Joint) সমস্যা

কিছু ওষুধ

কিছু ওষুধ টিনিটাসের কারণ হতে পারে বা বাড়িয়ে দিতে পারে।

তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ করবেন না।

অন্যান্য কারণ

  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ
  • উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা
  • পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
  • ধূমপান
  • অতিরিক্ত চা, কফি বা এনার্জি ড্রিংক পান

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—

  • হঠাৎ এক বা দুই কানে শুনতে কমে যাওয়া
  • তীব্র মাথা ঘোরা
  • কান দিয়ে রক্ত বা পুঁজ পড়া
  • মুখ বেঁকে যাওয়া
  • শুধুমাত্র এক কানে দীর্ঘদিন ধরে শব্দ হওয়া
  • হৃদস্পন্দনের সঙ্গে মিলিয়ে “ধুপধুপ” শব্দ শোনা

কী কী পরীক্ষা লাগতে পারে?

সব রোগীর সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। আপনার সমস্যার ধরন অনুযায়ী চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করবেন।

সম্ভাব্য পরীক্ষাগুলো হলো—

কানের পরীক্ষা

  • কানের সম্পূর্ণ পরীক্ষা

শ্রবণশক্তি পরীক্ষা

  • পিওর টোন অডিওমেট্রি (PTA)
  • টিম্পানোমেট্রি
  • প্রয়োজনে অন্যান্য শ্রবণ পরীক্ষা

রক্ত পরীক্ষা

প্রয়োজন হলে—

  • রক্তে শর্করা (ডায়াবেটিস)
  • থাইরয়েড পরীক্ষা
  • রক্তস্বল্পতার পরীক্ষা
  • ভিটামিন বি১২
  • কিডনির কার্যকারিতা
  • কোলেস্টেরল

স্ক্যান

বিশেষ ক্ষেত্রে—

  • MRI
  • CT Scan
  • রক্তনালীর পরীক্ষা

টিনিটাসের চিকিৎসা কী?

চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে কারণের ওপর নির্ভর করে।

যেমন—

  • কানের ময়লা পরিষ্কার করা
  • কানের সংক্রমণের চিকিৎসা
  • শ্রবণশক্তি কমে গেলে Hearing Aid ব্যবহার
  • ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণ
  • প্রয়োজন হলে ওষুধ পরিবর্তন

সাউন্ড থেরাপি

নীরব পরিবেশে টিনিটাস বেশি অনুভূত হয়।

তাই হালকা—

  • গান
  • বৃষ্টির শব্দ
  • প্রকৃতির শব্দ
  • White Noise
  • ফ্যানের শব্দ

অনেকের ক্ষেত্রে উপকার করে।

টিনিটাস কাউন্সেলিং / TRT

বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে এই শব্দকে উপেক্ষা করতে শেখানো হয়।

মানসিক সহায়তা (CBT)

যদি টিনিটাসের কারণে উদ্বেগ, হতাশা বা ঘুমের সমস্যা হয়, তবে এই চিকিৎসা উপকারী হতে পারে।


টিনিটাস কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?

এটি রোগীদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্ন।

উত্তর হলো—সব ক্ষেত্রে নয়।

যদি টিনিটাসের কারণ কানের ময়লা, সংক্রমণ বা কোনো নিরাময়যোগ্য রোগ হয়, তাহলে চিকিৎসার পর শব্দ সম্পূর্ণ চলে যেতে পারে।

কিন্তু বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাস, দীর্ঘদিনের শব্দজনিত ক্ষতি বা কিছু অন্তঃকর্ণের রোগের কারণে হওয়া টিনিটাসের স্থায়ী বা শতভাগ নিরাময় বর্তমানে সম্ভব নয়।

তবে সুখবর হলো—

সঠিক চিকিৎসা, পরামর্শ, শ্রবণযন্ত্র, সাউন্ড থেরাপি এবং জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ টিনিটাস নিয়ে স্বাভাবিক ও স্বস্তিদায়ক জীবনযাপন করতে পারেন।


টিনিটাসের কোনো নিশ্চিত ওষুধ আছে কি?

বর্তমানে এমন কোনো ওষুধ নেই যা অধিকাংশ টিনিটাস স্থায়ীভাবে ভালো করতে পারে।

তবে প্রয়োজনে চিকিৎসক—

  • ঘুমের সমস্যা
  • উদ্বেগ
  • মানসিক চাপ
  • অন্যান্য সংশ্লিষ্ট রোগের জন্য ওষুধ দিতে পারেন।

“টিনিটাস সম্পূর্ণ সারিয়ে দেয়”—এ ধরনের বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হবেন না।


আপনি কী করতে পারেন?

✔ উচ্চ শব্দ থেকে কানকে রক্ষা করুন।

✔ দীর্ঘ সময় উচ্চ ভলিউমে হেডফোন ব্যবহার করবেন না।

✔ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

✔ ধূমপান ও অতিরিক্ত চা-কফি কমান (যদি এগুলোতে শব্দ বাড়ে)।

✔ নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

✔ পর্যাপ্ত ঘুমান।

✔ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এড়ানোর চেষ্টা করুন।

✔ সম্পূর্ণ নীরব পরিবেশে না থেকে হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড শব্দ ব্যবহার করুন।

✔ নিয়মিত চিকিৎসকের ফলো-আপ করুন।


মনে রাখবেন

টিনিটাস একটি সাধারণ সমস্যা।

এর কিছু কারণ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য, আবার কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে ভালো করা সম্ভব নয়।

তবে সঠিক পরীক্ষা, যথাযথ চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী টিনিটাসের বিরক্তি অনেকটাই কমিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

কানে দীর্ঘদিন শব্দ হলে দেরি না করে একজন নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *